চিন্তা সম্পর্কে রোমিলা থাপারের উক্তি
চিন্তা সম্পর্কে রোমিলা থাপারের উক্তি :
“কথা থামানো যেতে পারে, কিন্ত্ত চিন্তাকে স্তব্ধ করা যায় না”
— রোমিলা থাপারউক্তিটি ইংরেজিতে পড়ুন
উক্তিটির উৎস ও প্রসঙ্গ জানুন :
রোমিলা থাপার একজন প্রবীণ ইতিহাসবিদ। দিল্লি জহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যাপক। ভারতের পেশাগত ইতিহাস চর্চার একজন পুরধা ব্যক্তিত্ব। গত ১৬ ই সেপ্টেম্বর ২০২৫ এক স্মারক বক্তৃতায় তিনি প্রশ্ন তোলেন,
- ১) ভারতের বহুত্ববাদ কী এখনও টিকে থাকবে?
- ২) আমরা কি এমন একটি সমাজ গড়ে তুলতে পারব, যেখানে বিভিন্ন মতামত নিয়ে বিতর্ক ও আলোচনা সম্ভব?
- ৩) নাকি আমরা আমাদের সমাজকে কেবল একটি নির্দিষ্ট জীবনধারা ও চিন্তাধারায় আবদ্ধ করে ফেলতে চাই?
- ৪) ইতিহাসের কি শুধুমাত্র একটাই ব্যাখ্যা থাকবে এবং অন্য সব ব্যাখ্যাকে বাতিল করা হবে?
- ৫) সংস্কৃতি কি কেবলমাত্র প্রধান সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক ভাষাতেই নির্ধারিত হবে, আর অন্য সংস্করণগুলি কি নিষিদ্ধ হবে?
১৬ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার ২০২৫ ‘ইন্ডিয়া ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার’ (আইআইসি)-এ অনুষ্ঠিত ‘তৃতীয় কপিলা বাৎস্যায়ন স্মারক বক্তৃতা’ দেন রোমিলা থাপার। ৯৪ বছর বয়সি প্রবীণ এই ইতিহাসবিদ বলেন, আমরা যারা ১৯৭০-এর দশকে জেএনইউ প্রতিষ্ঠার কাজে যুক্ত ছিলাম, তারা গত দশ বছরে তার ‘ধ্বংস’ দেখে স্তম্ভিত। শুধু জেএনইউ নয়, অন্যান্য শক্তিশালী সমাজবিজ্ঞান কেন্দ্রগুলিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমরা এমন একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলাম যা দেশে এবং বিদেশে অত্যন্ত সম্মানিত ছিল।
কিন্তু গত এক দশকে অ্যাকাডেমিক মান বজায় রাখা অত্যন্ত সমস্যাজনক হয়ে পড়েছে। কিছু নিম্নমানের শিক্ষক নিয়োগ, অপেশাদারদের দিয়ে পাঠ্যক্রম নির্ধারণ, গবেষণা এবং শিক্ষাদানের স্বাধীনতা হ্রাস করা ইত্যাদির মাধ্যমে এই ধ্বংসসাধন হয়েছে বলে মনে করছেন থাপার।
২০২০ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে সশস্ত্র হামলার ঘটনারও উল্লেখ করেন তিনি। উমর খালিদদের বিনা বিচারে জেলবন্দি করে রাখার দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, শিক্ষার উপর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ মেধাসম্পন্ন সৃজনশীলতাকে স্তব্ধ করে দেয়। শুধুমাত্র কর্তৃপক্ষের সমালোচনা করার জন্য ছাত্রদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে কয়েকজন বিচার ছাড়াই ছয় বছর ধরে জেলে রয়েছেন। দৃঢ়তার সঙ্গে তিনি বলেন, “কথা থামানো যেতে পারে, কিন্তু চিন্তাকে স্তব্ধ করা যায় না।”
ভারতের বর্তমান ইতিহাস শিক্ষার পদ্ধতির সমালোচনা করে রোমিলা থাপার বলেন, আজকের, ইতিহাস শিক্ষায় যেটা প্রচার করা হচ্ছে তা মূলত পরিত্যক্ত ঔপনিবেশিক তত্ত্বগুলিতে ফিরে যাওয়া। তথাকথিতভাবে ‘উপনিবেশ মুক্তি’ বলে দাবি করা হলেও আসলে তা নয়, কারণ এটা ঔপনিবেশিক শিক্ষাকেই সমর্থন করে। এই তথাকথিত নতুন ইতিহাস দাবি করে যে, গত ৭৫ বছর ধরে স্বাধীনোত্তর ভারতে যেটা লেখা ও শেখানো হয়েছে, সেটিকে প্রতিস্থাপন করবে। আর তার একটি বড় অংশকে সুবিধাজনকভাবে মার্কসবাদী বলে দাগিয়ে দেওয়া হয়, ভুল বলা হয় এবং বাতিল করে দেওয়া হয়।
ইতিহাস শিক্ষার ‘হিন্দুত্ববাদী সংস্করণ’ নিয়ে রোমিলা থাপার বলেন, এটা আর্য জাতির শ্রেষ্ঠত্ব এবং দ্বি-জাতি তত্ত্বের ঔপনিবেশিক তত্ত্বকে সমর্থন করে। এতে বলা হয় যে, ভারতের যথাযথ ভবিষ্যৎ কেবল একটি হিন্দু রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার মধ্যেই নিহিত। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ভারতের মতো বৈচিত্রময় একটি সমাজ কি একটি একক ঐতিহ্যে সীমাবদ্ধ করা যেতে পারে? রোমিলা থাপার বক্তৃতা শুরু করেন এই বলে যে, ভারতীয় ইতিহাস দুটি ঔপনিবেশিক কাঠামোর মধ্যে বন্দি ছিল, আর্য জাতি তত্ত্ব এবং দ্বি-জাতি তত্ত্ব। দুটোই, তিনি বলেন, গভীরভাবে প্রোথিত এবং ভারতীয় ইতিহাসকে প্রাথমিকভাবে গঠন করেছিল। তিনি ব্যাখ্যা করেন, কীভাবে ঔপনিবেশিক পণ্ডিতেরা আর্যদের একটি 'উচ্চতর জাতি' হিসাবে দেখিয়েছেন যারা মধ্য এশিয়া থেকে আগত, যা উচ্চবর্ণের সংস্কৃতিক প্রাধান্যের ভিত্তি তৈরি করেছিল। উচ্চবর্ণ হিন্দুরা নিজেদের আর্যদের বংশধর দাবি করে এবং হিন্দুধর্মও তার উৎপত্তি আর্যদের কাছ থেকেই দাবি করে।
রোমিলা থাপার বলেন, স্কটিশ ইতিহাসবিদ জেমস মিল-এর ‘দ্য হিস্ট্রি অব ব্রিটিশ ইন্ডিয়া’ বই থেকেই দুই-জাতি তত্ত্বের ভিত্তি তৈরি হয়। মিল যুক্তি দিয়েছিলেন যে, ভারত মূলত দুটি' জাতির সমষ্টি হিন্দু ও মুসলমান। তাঁর মতে, এই তত্ত্ব একটি সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করে যার ফলে হিন্দু-মুসলমান দ্বন্দ্বকে দ্বিতীয় সহস্রাব্দের প্রধান বিষয় হিসাবে দেখানো হয়। পেশাদার ইতিহাসবিদরা বহু দশক আগেই এসব ব্যাখ্যা যুক্তি ও তথ্য দিয়ে খণ্ডন করেছেন। তবু আজও এসব তত্ত্ব জনপরিসরে ফিরে আসছে এবং হিন্দুত্ববাদী মতাদর্শে প্রচারিত হচ্ছে। তিনি বলেন, হিন্দুত্বের যে ব্যাখ্যা আজ সর্বব্যাপী, তাতে বলা হচ্ছে, ভারতের ভবিষ্যৎ হিন্দু রাষ্ট্র হিসাবে নির্ধারিত এবং দাবি করা হচ্ছে, ভারতের সংস্কৃতি সর্বদাই হিন্দু সংস্কৃতি। থাপার সতর্ক করে বলেন, দুই-জাতি তত্ত্ব মেনে নিলে হিন্দুরা হবে ‘প্রধান নাগরিক’ আর অন্য ধর্মাবলম্বীরা, ‘গৌণ’। এই ধারণা গণতন্ত্রের পরিপন্থী।
এই স্মারক বক্তৃতায় তিনি দাবি করেন, “ইতিহাস যেভাবে পড়ানো এবং শেখানো হয়, তা নির্ভরযোগ্য ও. সঠিক হতে হবে এবং এর জন্য জরুরি, ইতিহাসকে রাজনৈতিক বা অন্য কোনও উদ্দেশ্যে বিকৃত না করা।” তিনি বলেন, এই জায়গায় শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, যেখানে প্রশিক্ষিত ও দক্ষ শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করতে উৎসাহ দেবেন। প্রসঙ্গত তিনি উল্লেখ করেন, একসময় সরকার পরিচালিত স্কুলগুলিতে শিক্ষার্থীরা এমন এক শিক্ষা পেতো, যা অন্ততপক্ষে তারা যে সমাজে বাস করছে সেটার মৌলিক কিছু ধারণা দিতো। আজ তা প্রায় অনুপস্থিত।
এই বক্তৃতায় তিনি এও দাবি করেন, স্বাধীনতার পর একসময়, সহনশীলতা ও অহিংসা ছিল ভারতীয় মূল্যবোধের অংশ। আজ, এই শব্দগুলি প্রকাশ্য আলোচনায় আর শোনা যায় না।
তিনি আলোচনার শেষ করেন মূলত দুটি মৌলিক প্রশ্ন তুলে—
১) আমরা কি ভারতের স্বাধীন, ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক সমাজের ঔপনিবেশিকতা-বিরোধী স্বপ্নকে আবারও ফিরিয়ে আনতে পারবো?
২) এমন একটি সমাজ কি গড়ে তুলতে পারবো, যা চিন্তার স্বাধীনতা, বিতর্ক, সম্মতি ও ভিন্নমতের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে?
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন