সন্ত্রাসবাদ সম্পর্কে হাওয়ার্ড জিনের উক্তি
সন্ত্রাসবাদ সম্পর্কে হাওয়ার্ড জিনের উক্তি :
“সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কীভাবে সম্ভব, যখন সেই যুদ্ধটা নিজেই সন্ত্রাসবাদ?”
— হাওয়ার্ড জিনউক্তিটি ইংরেজিতে পড়ুন।
উক্তিটির উৎস ও প্রসঙ্গ জানুন :
📝 উক্তিটি ও এর প্রেক্ষাপট
হাওয়ার্ড জিন-এর মতে, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা একটি মৌলিক অসঙ্গতি বহন করে। তাঁর মতে, যুদ্ধ নিজেই সন্ত্রাসবাদের সবচেয়ে চরম রূপ। কারণ, এতে ব্যাপক আকারে নিরীহ সাধারণ মানুষ নিহত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই তিনি মার্কিন সরকারের দাবিকৃত ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’-কে প্রতারণা ও নৈতিক সঙ্কট হিসেবে দেখতেন।⏳ কালপঞ্জি ও পটভূমি (কখন এবং কেন)
এই মন্তব্যের পটভূমি ছিল ২০০১ সালের ৯/১১-এর সন্ত্রাসী হামলার পরবর্তী সময়।· তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া (২০০১):
২০০১ সালের ৯/১১-এর কয়েকদিন পরেই, ২৩শে সেপ্টেম্বর, ২০০১-এ ‘লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমস’-এ প্রকাশিত একটি নিবন্ধে তিনি লিখেন: “যুদ্ধ হল সন্ত্রাসবাদ, যা শতগুণ বর্ধিত”। একই বছরের ডিসেম্বরে, তিনি আফগানিস্তানে বোমাবর্ষণকে অপরাধ বলে অভিহিত করেন এবং স্পষ্ট করেন যে সামরিক শক্তি প্রয়োগ সন্ত্রাস দমন না করে বরং তা নতুন করে সন্ত্রাসের জন্ম দেয়।
· পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ (২০০৪):
তিনি ১লা নভেম্বর, ২০০৪-এ The Progressive ম্যাগাজিনে “Our War on Terrorism” শিরোনামে একটি প্রবন্ধ লেখেন। সেখানেই তিনি তাঁর বিখ্যাত উক্তিটি করেন: “যুদ্ধ যেহেতু নিজেই সন্ত্রাসবাদের সবচেয়ে চরম রূপ, তাই সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ গভীরভাবে স্ববিরোধী”। তিনি জর্জ ডব্লিউ. বুশের নেতৃত্বে মার্কিন সরকারের আফগানিস্তান ও ইরাকে সামরিক অভিযান এবং ইসরায়েল ও রাশিয়ার অনুরূপ নীতির সমালোচনা করেন।
📍 অবস্থান ও প্রকাশনা (কোথায়)
জিন তাঁর এই পর্যবেক্ষণ বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন:- ম্যাগাজিন: The Progressive ম্যাগাজিনে ২০০১ এবং ২০০৪ সালে লেখা নিবন্ধে।
- সংবাদপত্র: লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমস-এ ২০০১ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত নিবন্ধে ।
- বই: তার ‘Howard Zinn Speaks’ বইতেও এই উক্তিটি সংকলিত হয়েছে ।
- বক্তৃতা: ২০০২ সালে নিউপোর্ট বিচ এবং হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলে দেওয়া বক্তৃতাসহ বিভিন্ন স্থানে তিনি এই মতামত ব্যক্ত করেন।
🤔 কেন এই মন্তব্য করেছিলেন? (কারণ ও উদ্দেশ্য)
হাওয়ার্ড জিন এই মন্তব্যের মাধ্যমে কয়েকটি বিষয় তুলে ধরতে চেয়েছিলেন:ক) নৈতিক অসঙ্গতি উন্মোচন:
সরকারগুলোর পক্ষে একই কাজ (নিরীহ মানুষ হত্যা) নিজেরা করলে তা ‘ন্যায্য যুদ্ধ’ আর প্রতিপক্ষ করলে তা ‘সন্ত্রাস’ বলে অভিহিত করার নৈতিক অসঙ্গতি তুলে ধরা ।
খ) সন্ত্রাসের মূল কারণ অনুসন্ধান:
তিনি বিশ্বাস করতেন, সন্ত্রাস দমনের নামে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উচিত তার বৈদেশিক নীতি পুনর্বিবেচনা করা, যা মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দিচ্ছে।
গ) সহিংসতার চক্র ভঙ্গ:
তিনি ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে বারবার দেখিয়েছেন যে, সহিংসতার জবাব সহিংসতা দিয়ে দিলে তা কখনো শেষ হয় না, বরং এর ফলে একটি ধ্বংসাত্মক চক্র তৈরি করে।
ঘ) বিকল্প পথের নির্দেশ:
জিন সামরিক শক্তির পরিবর্তে কূটনীতি, বৈশ্বিক সম্পদের ন্যায্য বণ্টন এবং মানবিক সহায়তার মাধ্যমে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
উক্তিটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট :
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় রোয়ান (Royan) শহরে, যা ফ্রান্সের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত, হাওয়ার্ড জিন যে বোমা হামলায় অংশ নিয়েছিলেন, সেই বোমার নাম ছিল ন্যাপালম (Napalm)। ১৯৪৫ সালের ১৯শে এপ্রিল, অর্থাৎ ইউরোপে যুদ্ধ শেষ হওয়ার মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে, মার্কিন বিমান বাহিনী এই প্রথমবারের মতো যুদ্ধক্ষেত্রে ন্যাপালম বোমা ব্যবহার করে। এই ঘটনা তার জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে।· মিশনের বিবরণ:
B-17 বোমারু বিমানের ডানার নিচে বড় বড় ক্যানিস্টারে করে জেলযুক্ত পেট্রল ও রবারের মিশ্রণ বোঝাই করা হয়েছিল এবং রোয়ানের আশেপাশের বনাঞ্চলে ফেলা হয়েছিল। লক্ষ্য ছিল জার্মান সৈন্যরা অবস্থান করছিল এমন এলাকা ধ্বংস করা ।
· হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতি:
এই আগুন-বোমা হামলায় প্রায় ৫,০০০ জার্মান সৈন্য এবং প্রায় ১০০০-এরও বেশি ফরাসি বেসামরিক নাগরিক নিহত হন। গোটা এলাকা পুড়ে ছাই হয়ে যায়।
· হাওয়ার্ড জিনের ভূমিকা:
তরুণ পাইলট লেফটেন্যান্ট হাওয়ার্ড জিন এই মিশনে অংশ নিয়েছিলেন। পরবর্তীতে তিনি এই ঘটনা নিয়ে গভীর গবেষণা ও লেখালেখি করেন এবং এটিকে ইতিহাসের পাতা থেকে তুলে আনেন।
· পরবর্তী প্রভাব:
এই ঘটনা হাওয়ার্ড জিনের মনে গভীর প্রভাব ফেলে। যুদ্ধের এই ভয়াবহতা এবং বেসামরিক মানুষের মৃত্যু তাঁকে আজীবন যুদ্ধবিরোধী ও শান্তিকামী ব্যক্তিত্বে পরিণত করতে সাহায্য করে। তাঁর বিখ্যাত উক্তি ‘সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ নিজেই সন্ত্রাসবাদ’-এর শেকড় সম্ভবত এই রকম বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকেই গড়ে উঠেছিল।
বিশ্লেষণ :
মূলত এই সমস্ত ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ‘এ পিপলস্ হিস্ট্রি’ লেখার প্রধান প্রেরণদাতা। এবং এই ‘এ পিপলস্ হিস্ট্রি’-তে বর্ণিত দর্শনের মধ্যেই ‘সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ নিজেই সন্ত্রাসবাদ’ —এই উক্তিটির গভীর শিকড় প্রোথিত। হাওয়ার্ড জিনের প্রতিটি লেখা ও বক্তব্য যেন তাঁর ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গিরই একটি শাখাপ্রশাখা মাত্র।১. ক্ষমতার কাঠামো ও ‘রাষ্ট্রীয় অপরাধ’ ধারণা :
· বইয়ের দর্শন:‘এ পিপলস্ হিস্ট্রি" জুড়ে জিন দেখান, রাষ্ট্র ও ক্ষমতাবান এলিট শ্রেণী তাদের নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য যুদ্ধ, গণহত্যা ও নিপীড়ন চালিয়েছে। ক্রিস্টোফার কলম্বাস থেকে শুরু করে ভিয়েতনাম যুদ্ধ পর্যন্ত, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সংঘটিত এই সহিংসতাকে তিনি চিহ্নিত করেন।
· উক্তির প্রেক্ষাপট:
· উক্তির প্রেক্ষাপট:
৯/১১-এর পর মার্কিন সরকার আফগানিস্তান ও ইরাকে যে সামরিক অভিযান চালায়, জিন তাকে একই "রাষ্ট্রীয় অপরাধ" হিসেবে দেখেন। তার মতে, যখন একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র অত্যাধুনিক অস্ত্র নিয়ে হাজার হাজার বেসামরিক মানুষ হত্যা করে, তখন সেটি সন্ত্রাস দমন না হয়ে বরং সন্ত্রাসেরই একটি চরম রূপে পরিণত হয়।
২. "শত্রু" সৃষ্টির কৌশল ও সাধারণ মানুষের জীবন
· বইয়ের দর্শন:জিন বারবার দেখিয়েছেন, যুদ্ধ বা সংঘাতের সময় রাষ্ট্র কীভাবে একটি "শত্রু" তৈরি করে জনমতকে সংগঠিত করে। এই প্রক্রিয়ায় সাধারণ মানুষ (যাদের পক্ষে জিন ইতিহাস লেখেন) উভয় পক্ষেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়—একদিকে যারা বোমা ফেলে, অন্যদিকে যাদের উপর বোমা পড়ে।
· উক্তির প্রেক্ষাপট:
· উক্তির প্রেক্ষাপট:
সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যেমন জঙ্গিরা "শত্রু" হিসেবে চিহ্নিত হয়, তেমনি এই যুদ্ধের নামে আফগানিস্তান ও ইরাকের সাধারণ গ্রামবাসী, বিবাহের অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া লোকজন বা হাসপাতালের রোগীরা মার্কিন বোমার শিকার হন। জিন এই "দুই পক্ষেরই" সাধারণ মানুষের দুর্ভোগকে একই সূত্রে গেঁথে দেখেন।
৩. ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ও দ্বৈত নীতি
· বইয়ের দর্শন:ফিলিপিন-আমেরিকান যুদ্ধ থেকে শুরু করে ভিয়েতনাম যুদ্ধ পর্যন্ত—প্রতিটি সামরিক অভিযানে জিন একই প্যাটার্ন দেখেছেন: "আমরা" যা করি তা সভ্যতা ও শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য, আর "তারা" যা করে তা সন্ত্রাস।
· উক্তির প্রেক্ষাপট:
· উক্তির প্রেক্ষাপট:
এই দ্বৈত নীতিই তার সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দু। জিন প্রশ্ন তোলেন, হিরোশিমা-নাগাসাকিতে বোমা ফেলা এবং নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ারে হামলা—দুটোর ফলেই যদি নিরীহ মানুষ মারা যায়, তাহলে একটিকে "ন্যায্য যুদ্ধ" আর অন্যটিকে "সন্ত্রাস" বলার যুক্তি কোথায়?
৪. ইতিহাসের নীরব কণ্ঠস্বর
· বইয়ের দর্শন:"এ পিপলস্ হিস্ট্রি"-র মূল লক্ষ্যই হলো ইতিহাসের পাতা থেকে হারিয়ে যাওয়া সাধারণ মানুষের গল্প বলা। যাদের কথা কেউ বলে না, তারাই জিনের নায়ক।
· উক্তির প্রেক্ষাপট:
· উক্তির প্রেক্ষাপট:
সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের খবরে আমরা "সন্ত্রাসী নিহত" বা "নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস" করার পরিসংখ্যান দেখি। কিন্তু জিন তার উক্তির মাধ্যমে আমাদের মনে করিয়ে দেন, এই সংখ্যাগুলোর পেছনে লুকিয়ে আছে হাজারো সাধারণ মানুষের জীবন—যাদের নাম কখনো ইতিহাসের পাতায় স্থান পায় না। তাদের পক্ষেই তিনি তার এই সমালোচনা করেন।
৫. প্রতিরোধের অধিকার
· বইয়ের দর্শন:জিনের মতে, ইতিহাস জুড়ে নিপীড়িত মানুষের প্রতিরোধ সবসময়ই জায়েজ ছিল। দাসপ্রথা, শোষণ, বর্ণবাদ—এগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই ইতিহাসের অগ্রগতি এনেছে।
· উক্তির প্রেক্ষাপট:
· উক্তির প্রেক্ষাপট:
তিনি মনে করতেন, যখন একটি সাম্রাজ্যবাদী শক্তি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে সামরিক হস্তক্ষেপ চালায়, তখন তার বিরুদ্ধে স্থানীয় জনগণের প্রতিরোধ (যা তারা ‘সন্ত্রাস’ নামে অভিহিত করে) একটি অনিবার্য ফলাফল। এই প্রতিরোধকে শেষ করার একমাত্র উপায় হলো সামরিক শক্তি নয়, বরং সেই অন্যায় নীতির পরিবর্তন যা প্রতিরোধের জন্ম দেয়।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন