যুদ্ধের উৎস সম্পর্কে কেনেথ ওয়ালটোজের উক্তি
যুদ্ধের উৎস সম্পর্কে কেনেথ ওয়ালটোজের উক্তি
“যুদ্ধের উৎস মানুষের স্বভাব, তাতে থাকা স্বার্থপরতা, দিশাহীন হিংস্রতা এবং অবশ্যই মানুষের নির্বুদ্ধিতা।”
—কেনেথ ওয়ালটজ
উক্তিটি ইংরেজিতে পড়ুন
উক্তিটির উৎস ও প্রসঙ্গ জানুন :
উদ্ধৃতিটির উৎস :
কেনেথ ওয়ালটজের এই উদ্ধৃতির উৎস হলো তাঁর ১৯৫৯ সালের বই Man, the State, and War-এর দ্বিতীয় অধ্যায়।উদ্ধৃতির পূর্ণাঙ্গ অংশ :
“আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রথম ইমেজ অনুযায়ী, যুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ কারণগুলোর অবস্থান মানুষের প্রকৃতি ও আচরণে। যুদ্ধের উৎপত্তি হয় স্বার্থপরতা, ভুল পথে চালিত আক্রমণাত্মক প্রবণতা এবং নির্বুদ্ধিতা থেকে।”উদ্ধৃতিটির প্রসঙ্গ :
কেনেথ ওয়ালটজ বর্তমান বিশ্বের যুদ্ধের কারণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে এই উক্তিটি করেছিলেন। ওয়ালটজ কলাম্বিয়া ও বার্কলি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ছিলেন এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ‘নব্য-বাস্তববাদ’ (Neorealism) তত্ত্বের প্রতিষ্ঠাতাদের একজন। Man, the State, and War গ্রন্থে তিনি দেখান যে যুদ্ধের ব্যাখ্যাগুলোকে তিনটি স্তরে বা ‘ইমেজে’ ভাগ করা যায়।১. প্রথম ইমেজ: মানুষের প্রকৃতি (Human Nature) :
মূল বক্তব্য :
প্রথম ইমেজ অনুযায়ী যুদ্ধের মূল কারণ হল মানুষের অন্তর্নিহিত স্বভাব। এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী ধরে নেওয়া হয় যে মানুষ জন্মগতভাবে স্বার্থপর, আক্রমণাত্মক, নির্বুদ্ধি অথবা ক্ষমতালোভী। যুদ্ধকে দেখা হয় ব্যক্তিগত ত্রুটির সমষ্টিগত রূপ হিসেবে।
দার্শনিক ভিত্তি :
ওয়ালটজ এই স্তরটি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বেশ কয়েকজন চিন্তাবিদের নাম উল্লেখ করেছেন:
১) থুসিডাইডিস (Thucydides): মেলীয় সংলাপে দেখান, শক্তিশালীরা যা করতে পারে, দুর্বলীরা তা মেনে নেয়—একে তিনি মানব-স্বভাবের অনিবার্য নিয়ম বলে চিহ্নিত করেন।
২) হবস (Thomas Hobbes): প্রকৃতির অবস্থায় মানুষের জীবন “একাকী, দরিদ্র, নোংরা, পশুসুলভ ও সংক্ষিপ্ত”। যুদ্ধ এড়াতে মানুষ সামাজিক চুক্তি করে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে, কিন্তু সেই রাষ্ট্রের ভেতরেও স্বভাবের প্রভাব থেকে যায়।
৩) স্পিনোজা (Spinoza): মানুষের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার মূল চালিকা শক্তি হলো আত্মরক্ষার প্রবৃত্তি (conatus)। এই প্রবৃত্তি যখন অন্যের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় রূপ নেয়, তখন সংঘর্ষ অনিবার্য।
৪) রুশো (Jean-Jacques Rousseau): Man, the State, and War–এর প্রথম ইমেজের আলোচনায় রুশোকে ওয়ালটজ বিশেষভাবে বিশ্লেষণ করেন। রুশো মনে করেন, মানুষ জন্মগতভাবে খারাপ নয়, কিন্তু সামাজিকীকরণের সময়ে অহংবোধ, প্রতিযোগিতা ও অমর্যাদাবোধ তৈরি হয় যা যুদ্ধের জন্ম দেয়।
আরও পড়ুন : মেলীয় সংলাপ কী?
ওয়ালটজের সমালোচনা
ওয়ালটজ প্রথম ইমেজকে অপর্যাপ্ত মনে করেন। তাঁর যুক্তি:
1. মানব-স্বভাব অপরিবর্তনীয় বলে ধরে নিলে শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ বন্ধ হয়ে যায়।
2. একই মানব-স্বভাবকে ব্যবহার করে পরস্পরবিরোধী তত্ত্ব দাঁড় করানো যায়—কেউ বলেন মানুষ সহজাতভাবে শান্তিপ্রিয়, কেউ বলেন আক্রমণাত্মক। ফলে এই স্তর কোনো নির্দিষ্ট নীতি-নির্দেশনা দিতে পারে না।
3. ব্যক্তির স্বভাবকে অপরিবর্তনীয় ধরলেও যুদ্ধের তীব্রতা ও ফ্রিকোয়েন্সি কেন ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ভিন্ন হয়, তার ব্যাখ্যা দেয় না।
২. দ্বিতীয় ইমেজ: রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ কাঠামো (Internal Structure of States) :
মূল বক্তব্য :
দ্বিতীয় ইমেজ যুদ্ধের কারণ খোঁজে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থা, অর্থনৈতিক কাঠামো, মতাদর্শ বা সামাজিক সংঘাতে। ধারণাটি হলো: কিছু রাষ্ট্র প্রকৃতিগতভাবে যুদ্ধপ্রিয় বা সম্প্রসারণবাদী হয়ে ওঠে তাদের অভ্যন্তরীণ গঠনের কারণে।
প্রধান তাত্ত্বিক উদাহরণ
ক) লিবারেল/গণতান্ত্রিক শান্তি তত্ত্ব (Democratic Peace Theory):
ইমানুয়েল কান্টের ধারণার ওপর ভিত্তি করে বলা হয় যে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলি পরস্পরের সঙ্গে যুদ্ধ করে না। কারণ জনগণের সম্মতি ছাড়া যুদ্ধ শুরু করা কঠিন এবং প্রতিষ্ঠানগত চেক অ্যান্ড ব্যালান্স যুদ্ধের ঝুঁকি কমায়।
খ) মার্কসবাদী/লেনিনবাদী বিশ্লেষণ:
লেনিনের Imperialism, the Highest Stage of Capitalism–এ যুদ্ধকে পুঁজিবাদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের বাহ্যিক প্রকাশ বলা হয়। পুঁজিপতিরা বাজারের সন্ধানে ও পুঁজি রফতানির জন্য সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ চালায়।
গ) ইকোনমিক ন্যাশনালিজম:
কিছু তত্ত্ব বলে যে রাষ্ট্র যখন অভ্যন্তরীণ অর্থনৈিক সংকটে পড়ে, তখন জনগণের মনোযোগ ঘুরিয়ে দিতে বহির্বিশ্বের সঙ্গে সংঘর্ষ সৃষ্টি করে (ডাইভারশনারি ওয়ার থিসিস)।
ওয়ালটজের সমালোচনা
১. অভ্যন্তরীণ কাঠামো গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা চূড়ান্ত কারণ নয়: উদাহরণস্বরূপ, নাৎসি জার্মানি বা সোভিয়েত রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থা ভিন্ন ছিল, কিন্তু উভয়ই আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় শক্তি প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছিল।
২. একই অভ্যন্তরীণ কাঠামোর রাষ্ট্র ভিন্ন আচরণ করতে পারে: অনেক গণতন্ত্র পরস্পরের সঙ্গে যুদ্ধ না করলেও গণতন্ত্রী রাষ্ট্র অধিক গণতন্ত্রবিরোধী রাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ করেছে। তাই শুধু অভ্যন্তরীণ কাঠামো দিয়ে যুদ্ধের পূর্ণ ব্যাখ্যা সম্ভব নয়।
৩. আন্তর্জাতিক চাপ : রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ গঠন যেমনই হোক, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার চাপ (অন্য রাষ্ট্রের হুমকি) তাকে সেভাবে সাড়া দিতে বাধ্য করে।
৩. তৃতীয় ইমেজ: আন্তর্জাতিক নৈরাজ্য (International Anarchy) :
মূল বক্তব্য :
তৃতীয় ইমেজ যুদ্ধের কারণ হিসেবে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার কাঠামোগত বৈশিষ্ট্যকে চিহ্নিত করে। ওয়ালটজের মতে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের অনুপস্থিতি—অর্থাৎ, রাষ্ট্রগুলোর ওপরে কোনো বৈশ্বিক সরকার নেই। এই নৈরাজ্যের মধ্যেই প্রতিটি রাষ্ট্রকে নিজের নিরাপত্তা নিজেই নিশ্চিত করতে হয়।
কেন এটি অনন্য :
· নৈরাজ্য মানে বিশৃঙ্খলা নয়, বরং অনুক্রমের (hierarchy) অনুপস্থিতি। রাষ্ট্রগুলি আইনত সমান (সার্বভৌম), কিন্তু বাস্তবে ক্ষমতার পার্থক্য থাকে।
· নিরাপত্তা দ্বিধা (security dilemma) :
একটি রাষ্ট্র যখন নিজের নিরাপত্তা বাড়ায় (অস্ত্র বৃদ্ধি, জোট গঠন), অন্য রাষ্ট্র তা হুমকি হিসেবে দেখে এবং তারাও নিজেদের সুরক্ষিত করে। এই প্রক্রিয়ায় অস্ত্র প্রতিযোগিতা ও উত্তেজনা বাড়ে, যা যুদ্ধের সম্ভাবনা সৃষ্টি করে।
· স্ব-সাহায্য ব্যবস্থা (self-help system) :
আন্তর্জাতিক আইন বা নৈতিকতা থাকলেও তা বলবৎ করার কোনো কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব নেই। তাই রাষ্ট্রগুলি সবসময় নিজেদের স্বার্থ ও নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়।
ওয়ালটজের অবস্থান :
Man, the State, and War-এর শেষে ওয়ালটজ সিদ্ধান্ত নেন যে তৃতীয় ইমেজটি সবচেয়ে বেশি ব্যাখ্যামূলক শক্তি রাখে। কারণ:
· প্রথম ও দ্বিতীয় ইমেজ যুদ্ধের তাৎক্ষণিক কারণ বা অবস্থাগত কারণ ব্যাখ্যা করতে পারে, কিন্তু যুদ্ধ কেন সবসময় সম্ভাব্য হয়ে থাকে, তার উত্তর শুধু তৃতীয় ইমেজ দেয়।
· “আন্তর্জাতিক নৈরাজ্যের কাঠামো না বদলালে” শুধু রাষ্ট্রের প্রকৃতি বা মানুষের স্বভাব বদলে যুদ্ধ বন্ধ হবে না।
পরবর্তীতে ওয়ালটজ তাঁর Theory of International Politics (১৯৭৯)-এ এই চিন্তাকে আরও কাঠামোবদ্ধ করেন, যা নব্য-বাস্তববাদ (neorealism) নামে পরিচিত। সেখানে তিনি তৃতীয় ইমেজকেই কেন্দ্রীয় তত্ত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন এবং প্রথম দুটি ইমেজকে “হ্রাসবাদী” (reductionist) বলে চিহ্নিত করেন।
তিনটি ইমেজের তুলনামূলক ছক :
ইমেজ কেন্দ্রীয় কারণ মূল প্রতিনিধি ওয়ালটজের মূল্যায়ন
প্রথম মানব-স্বভাব (স্বার্থপরতা, আগ্রাসন) হবস, স্পিনোজা, রুশো প্রয়োজনীয় কিন্তু অপর্যাপ্ত; অপরিবর্তনীয় ধরে নিলে শান্তির পথ বন্ধ
দ্বিতীয় রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ কাঠামো (শাসন, অর্থনীতি) লেনিন, গণতান্ত্রিক শান্তি তাত্ত্বিকরা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু আন্তর্জাতিক চাপের কারণ ব্যাখ্যায় সীমিত
তৃতীয় আন্তর্জাতিক নৈরাজ্য (কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের অভাব) ওয়ালটজ নিজে সবচেয়ে মৌলিক কারণ; কাঠামো না বদলালে যুদ্ধের সম্ভাবনা দূর হয় না
সমাপ্তি: তিনটি ইমেজের সমন্বয় :
ওয়ালটজ পুরোপুরি প্রথম ও দ্বিতীয় ইমেজকে বর্জন করেননি। তাঁর দৃষ্টিতে:
· যুদ্ধের তাৎক্ষণিক কারণ বা নির্দিষ্ট ঘটনা ব্যাখ্যায় প্রথম ও দ্বিতীয় ইমেজ ভূমিকা রাখে।
· কিন্তু যুদ্ধ কেন মানব-ইতিহাসের পুনরাবৃত্ত ঘটনা, তার কাঠামোগত ব্যাখ্যা শুধু তৃতীয় ইমেজ দিতে পারে।
পরবর্তীকালে এই তিন ইমেজের পদ্ধতি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের তত্ত্বে এতটাই প্রভাবশালী হয় যে অনেক গবেষক যেকোনো যুদ্ধ বা সংঘাত বিশ্লেষণে ইচ্ছাকৃতভাবে এই তিন স্তরে কারণ চিহ্নিত করার চেষ্টা করেন।
উদ্ধৃতিটি ওয়ালটজের প্রথম ইমেজটির সঙ্গে বিশেষভাবে সম্পর্কিত। যদিও যুদ্ধের কারণ সম্পর্কে তাঁর নিজস্ব যুক্তি তৃতীয় স্তর বা ইমেজের উপর বেশি গুরুত্ব দেয়।
----------xx-----------
"The source of war is human nature—the selfishness in it, aimless ferocity, and certainly human stupidity."
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন